খোলামত
তারুণ্যের শক্তিতে ছাত্রলীগের মানবিক পথচলা
সত্য, সুন্দর ও মানুষের মানবিক জনপদ গড়ে তুলতে সমাজের যে অংশ সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সে অংশের নাম ছাত্রসমাজ। যুগে যুগে কালে কালে সমাজের জ্ঞান পিপাসু তরুণরাই সকল অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্চনার বিরুদ্ধে সবার আগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। লড়াই করছে প্রাণপণ।

সত্য, সুন্দর ও মানুষের মানবিক জনপদ গড়ে তুলতে সমাজের যে অংশ সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সে অংশের নাম ছাত্রসমাজ। যুগে যুগে কালে কালে সমাজের জ্ঞান পিপাসু তরুণরাই সকল অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্চনার বিরুদ্ধে সবার আগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। লড়াই করছে প্রাণপণ।
পৃথিবীতে যত বিপ্লব হয়েছে, যুগে যুগে যত স্বাধীনতাকামী আন্দোলন হয়েছে তার সিংহভাগে ছিল তরুণরাই। তরুণদের অকুতোভয় চেতনার আলোতেই সমাজ, দেশ বা রাষ্ট্রের প্রবীণরা আবার ফিরে পেয়েছে তারুণ্য, তারুণ্যের স্ফুরিত শক্তি।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি জ্ঞান ও অনুধাবনে ছিলেন বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ, তরুণ বয়সেই ইতিহাস পাঠের প্রয়োগমূলক প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন ছাত্রলীগ। দেশ স্বাধীনের পর এর নাম হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আমরা যদি ছাত্রলীগের জন্মকালীন সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে আমরা বুঝতে পারবো কতটা সঠিক সময়ে জাতীয়তাবাদ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
একদিকে তখন সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগির ফলাফল হিসেবে দুটি সদ্য স্বাধীন দেশ। যার একটি দেশ যেন জোর করে বানানো কোনো অসম্পূর্ণ স্থাপত্য, যে দেশে কোনো নিবিড় চেতনার সম্মিলন নেই৷ একটি দেশ, যার একটি প্রদেশ দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে ১২০০ মাইল দূরে। নেই কোনো সাংস্কৃতিক ঐক্য, ভাষার মিল; উপরন্তু স্বাধীন হওয়ার অল্পকার পর থেকেই পাকিস্তানি সরকারের বাংলার সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন সাম্প্রদায়িক শোষকগোষ্ঠির সঙ্গে এই স্বাধীনচেতা বাঙালি জনপদ কোনোভাবেই একীভূত হতে পারবে না, কোনো দিও পারবে না সামরিক জান্তাদের পদানত হতে। বঙ্গবন্ধুর এই দূরদর্শী ভাবনার ফলই ছিলো ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাংলার ছাত্রসমাজই পারবে সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালনা করতে। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শীতা সত্য প্রমাণিত হয়।
শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতি; এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করা সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই পাকিস্তানিদের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের অধিকার আদায় থেকে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছাত্রলীগের অদম্য- অকুতোভয় নির্ভীক দৃঢ়তার সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল খাজা নাজিমুদ্দিনসহ পুরো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।
পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের বিজয় লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ছাত্রলীগ। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান যখন তার জনবিরোধী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে উন্মুখ হয়ে পড়ে সেইসময় আবারও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে শুরু হয় গণ-আন্দোলন।
স্বাধীনতাকামী, মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক ছাত্রসমাজ আবারো পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে বাধ্য করে গণবিরোধী প্রস্তাব বাতিল করতে। এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্রলীগ ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানসহ সকল গণ-আন্দোলনেই পুরো দেশের ছাত্র জনতা থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, মজদুরদের নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে তোলে।
৭০ এর নির্বাচন এমনকি ১৯৭১ সালের ২ মার্চ বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা সর্বপ্রথম উত্তোলন করেন ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা । এর মাধ্যমেই শুরু হয় স্বাধীনতার পথে গৌরবোজ্জ্বল পথ চলার আরেক অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী।
এই মুজিববাহিনী অসীম সাহসিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে। উন্নত রণকৌশলের সঙ্গে অকৃত্রিম দেশপ্রেম- এই ছিল মুজিববাহিনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলার মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছাত্রলীগের বীর সেনানীরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে রাখে অগ্রগণ্য ভূমিকা।
মুক্তিযুদ্ধের জনযুদ্ধে বিজয়ের ফলে বিশ্বের মানচিত্রে অঙ্কিত হয় একটি সদ্য স্বাধীন দেশ- বাংলাদেশ। এর আগে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় এই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঘোষিত ১১ দফা শুধু সেই সময়কার রাজনৈতিক আন্দোলনকে বেগবান করেনি, বরং এই ১১ দফার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য যা পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যতগুলো রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে তার সবগুলোতেই ছাত্রলীগ ছিলো অগ্রণী ভূমিকায়। শুধু তাই নয় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে পাকিস্তানপন্থীরা আবার এই দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার প্রয়াস নিচ্ছিলো তখনও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বুক চিতিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও যার বিনিময়ে আমরা আজ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক, নির্বিঘ্নে আমরা পাচ্ছি গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার।